>

পহেলা বৈশাখ ও বাঙালি মুসলিম সংস্কৃতি

পহেলা বৈশাখ ও বাঙালি মুসলিম সংস্কৃতি

যে কোন জাতির রাজনৈতিক পরাজয় শুরু হয় সাংস্কৃতিক পরাজয়ের মাধ্যমে। নিজেস্ব সংস্কৃতি না থাকলে একটি জাতির আত্মপরিচয় শক্তিশালী হয়না।প্রভাবশালী কোন সভ্যতাও গড়ে তোলা যায়না।ধার করা সংস্কৃতি নিয়ে বেঁচে থাকা যায় কর্তৃত্ব করা যায় না।”

আমার প্রথম পরিচয় মুসলিম। বাঙ্গালী হিসাবেও আমি গৌরব বোধ করি।কারণ মুসলমানদের (ফখরুদ্দীন মুবারক শাহ,ইলিয়াস শাহ) হাত ধরেই বাঙ্গালা এবং বাঙ্গালীর সুনির্দিষ্ট অস্তিত্ব আত্মপ্রকাশ করে।বাঙ্গালী জাতি হিসাবে আমাদের আছে হাজার বছরের নিজেস্ব ইতিহাস ও ঐতিহ্য। রয়েছে স্বকীয় সংস্কৃতি।

কিন্তু আঠারো শতকে বঙ্কিম ও রবীন্দ্রনাথরা বাঙ্গালীর ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি উৎপত্তি ও বিকাশের ক্রমধারায় প্রশ্ন তুলে।১২০০ থেকে ১৩৫০ বাঙালি সাহিত্যের সময়কাল কে অন্ধকার যুগ বলে অবহিত করে।বাঙালি মুসলিমদের প্রায় হাজার বছেরের চর্চিত ইতিহাস,ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে চুরি করে নিজেদের বলে চালিয়ে দেয়

পহেলা বৈশাখ ও বাঙালি মুসলিম সংস্কৃতি

ইতিহাস পাঠকদের জানা থাকার কথা ১৯০৫ যখন বঙ্গভঙ্গ হয়। তৎকালীন উঁচু শ্রেনীর হিন্দুরা বিরোধের দাহ প্রবলভাবে উত্তপ্ত করতে থাকে। ঢাকাকে কেন্দ্র করে আলাদা প্রাদেশিক সরকার গঠিত হবে,পূর্ব বাংলার মুসলমানরা উন্নত হবে তা উঁচু শ্রেনীর হিন্দুরা মানতে পারেনি। বিট্রিশ সরকারকে চাপ প্রয়োগ করে বঙ্গভঙ্গ রদ করে।

তৎকালীন হিন্দুরা ভারত উপমহাদেশ থেকে মুসলামনদের কর্তৃত্ব দমন করতে বিট্রিশ শাসনকে স্বাগত জানায়।যার ফলে বিট্রিশদের ভাষা ও সংস্কৃতিকে তারা ধারণ করে তৎকালীন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে অধিষ্ঠিত থাকে।

অন্যদিকে মুসলমানরা শৌর্যবীর্যের ঐতিহ্য রক্ষায় বিট্রিশ সরকারের ভাষা ও সংস্কৃতিকে প্রত্যাখান করে। নিজেদের স্বকীয়তা নিয়ে বাচঁতে চায়।ফলে মুসলমানরা প্রশাসনিক শক্তিতে পিছিয়ে পড়ে। আর হিন্দুরা সুযোগে বাঙ্গালি সংস্কৃতিতে রং মিশিয়ে দেশ-দুনিয়ায় বাঙ্গালি মুসলিম সংস্কৃতিকে হিন্দু সংস্কৃতি বলে প্রচার করে।বাঙালি মুসলামনদের প্রতি সাংস্কৃতিক আগ্রাসণ চলায় একের পর এক অপসংস্কৃতির ছোবল মারতে থাকে।

কষ্টের বিষয় এ ইতিহাস বাংলাদেশে ইসলামপন্থীদের অনেকেই মেনে নিয়েছে।যা ইসলামপন্থীদের রাজনৈতিক কর্মসূচি,চিন্তা ও মননে স্পষ্ট লক্ষণীয়।

কথা, বার্তায় ও রাজনৈতিক বক্তৃতায় প্রায় বলতে শুনা যায় নবান্ন উৎসব, পিঠা উৎসব, নববর্ষ এ সকল সংস্কৃতির সাথে মুসলমানদের কোন সম্পর্ক নাই। এগুলো হিন্দুদের চিন্তা চেতনা থেকে নিসৃত বলেও দাবি করে।

এ যেন নিজের ফসল অন্যের ঘরে উঠিয়ে দেওয়ার নামান্তর।

অথচ বাংলা নববর্ষ পালনের সূচনা হয় মূলত মুসলিম শাসক সম্রাট আকবরের সময়(১৫৫৬ খ্রী.) থেকেই। সে সময় বাংলার কৃষকরা চৈত্রমাসের শেষদিন পর্যন্ত জমিদার, তালুকদার এবং অন্যান্য ভূ-স্বামীর খাজনা পরিশোধ করত। পরদিন নববর্ষে ভূস্বামীরা তাদের মিষ্টিমুখ করাতেন। ক্রমান্বয়ে পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিশে পহেলা বৈশাখ আনন্দময় ও উৎসবমুখী হয়ে ওঠে।এবং জায়গা করে নেয় বাঙালি সংস্কৃতির অংশ হিসাবে।

বাংলা ও বাঙ্গালীর সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের পাঠ যদি আঠারো শতক থেকে নেওয়া হয়। এটা বাঙালি মুসলমানদের সাংস্কৃতিক পরাজয়। হিন্দুদের সাংস্কৃতিক বিজয়।

প্রাচীনকালে বাংলাদেশ বলতে কোন নাম ছিল না। এ অঞ্চল তখন অনেক গুলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যে বিভক্ত ছিল এবং রাজ্যগুলো বিভিন্ন জনপদ বা রাষ্ট্র নামে অভিহিত হতো।
মুসলিম শাসন পূর্বযুগে বঙ্গের যেমন সুনির্দিষ্ট রাষ্ট্রীয় সীমারেখা ছিল না তেমনি একটি পরিপূর্ণ জাতি হিসেবেও বাঙ্গালীদের আত্মপ্রকাশ ঘটেনি। ইলিয়াস শাহের শাসনামলের পুর্ব পর্যন্ত এ অবস্থা প্রচলিত ছিল ।

ইবনে বতুতার বর্ণনানুযায়ী মুসলিম শাসনের আগ পর্যন্ত যে বাঙ্গালীরা নিজদেরকে গৌড়িয় বলে পরিচয় দিতে গর্ব বোধ করত তারা মুসলিম শাসনামলে বাঙ্গালী জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে থাকে।

১৩৩৮ সালে ফকরুদ্দীন মুবারক শাহ সোনারগাঁওয়ে শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই বাঙ্গালার জনগণ তখন বাঙ্গালী নামে পরিচিত ছিল ।

অন্যদিকে শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ ‘লাখনৌতি’ ও ‘বঙ্গদেশকে’ একত্রিত করে এই যুক্ত অঞ্চলকে নাম দেন ‘বাঙ্গালাহ’ এবং এর অধিবাসীদের নাম দেন ‘বাঙালি’। আর তিনি নিজে শাহ- ই বাঙালাহ উপাধি ধারণ করে স্বাধীন ভাবে বাঙ্গালীদের জাতীয় শাসক হিসেবে শাসন কার্য পরিচালনা করেন।

ইলিয়াস শাহ-ই প্রথম বাঙ্গালী অধ্যুষিত সকল অঞ্চলের সমন্বয়ে বাঙ্গালা বা বঙ্গ গঠন করেন -যার সীমানা ছিল তেলিয়াগড়ি থেকে চট্টগ্রাম এবং হিমালয়ের পাদদেশে থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত । এ সময় থেকেই বঙ্গদেশ এবং বাঙ্গালী মুসলিম জাতির নবতর ইতিহাস যাত্রা শুরু।

অতএব আসুন আমাদের সংস্কৃতি আমরা আমাদের ঢংয়ে চর্চা করি।নিজেদের স্বকীয়তা নিয়ে পিঠা উৎসব, নবান্ন উৎসব ও নববর্ষকে চর্চা করি।হিন্দুয়ানী সংস্কৃতির নামে চালিয়া দেওয়া হাজার বছর ধরে চর্চিত ইসলাম বিধৌত বাঙ্গালী সংস্কৃতিকে পুনরুদ্ধারের শপথ নেই।

তথ্য সূত্র-১) ড.এম এ রহীম -বাংলাদেশের ইতিহাস
২)ড. আকবর আলী খান- বাঙ্গালী জাতি সত্ত্বার অন্বেষা
৩) রিচার্ড এস ইটন- The Rise of Islam and Bangla Front-Year.
৪) চেপে রাখা ইতিহাস – গোলাম মর্তুজা

Leave a Reply

Your email address will not be published.

error: Content is protected !!