>

রাজধানীতে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ-এর মহাসমাবেশ !

প্রায় চার বছর পর করোনা মহামারী পরবর্তী রাজধানীতে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ-এর মহাসমাবেশ !

ইসলামী আন্দোলন সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনশ’ আসনে দলীয় প্রতীক হাতপাখা মার্কায় প্রার্থী দিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। এ নিয়ে সর্বমহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছিল জোট নিরপেক্ষ একক ইসলাম পন্থী এ রাজনৈতিক দলটি। সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনসহ স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীকে অংশগ্রহণ ও ভোটের হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, তাক লাগিয়ে হারিয়ে না যাওয়ার ইঙ্গিত বহন করে।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এর রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ৩৫ বছরের হলেও মূলত তারা ২০০৮ সালে নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন জটিলতায় নাম পরিবর্তন করে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ( পূর্ব নাম ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন) নামে যাত্রা শুরু করে। তখন থেকেই নতুন নামে বাংলাদেশে একক ইসলাম পন্থী ধারা প্রত্যাবর্তনের উদ্দেশ্যে একলা চলো নীতিতে পথচলা শুরু করে। ২০০৮ থেকে ২০২২ নানা চরাই উতরাই পেরিয়ে এক যুগের রাজনৈতিক যাত্রায় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ দেশের রাজনীতিতে অন্যতম একটি মজবুত পাটাতন নির্মাণ করতে সক্ষম হয়েছে।

রাজধানীতে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ-এর মহাসমাবেশ !

ইসলামী আন্দোলন এর দীর্ঘ এ পথচলা সুখকর ছিল না । এদেশে ইসলাম পন্থার উপর রাজনীতি করা অনেকটা এসিড টেস্ট দেওয়ার মত। হাতে জলন্ত অঙ্গার নিয়ে ম্যারাথন রেসে প্রতিযোগিতার মত। যেকোন কর্মসূচি ও পলিসি নির্ধারণ ও নির্বাচনের ক্ষেত্রে একদিকে দেশের ওলামা সমাজ তো অন্যদিকে ব্রিটিশ পরবর্তী সময়ে গজিয়ে ওঠা এলিট সোসাইটি। এ দুই কোহর্টকে বিবেচনায় ইসলামী আন্দোলন তাদের কর্মসূচি ও পলিসি নির্ধারণে বরাবরই বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়ে এসেছে। যা এবারও তাদের মহাসমাবেশের কর্মসূচি ও দাবি দাওয়া নির্ধারণের ক্ষেত্রে ফুটে উঠেছে।

ইসলামী আন্দোলন এর মহাসমাবেশকে এবার দায়িত্বের বাহিরে থেকে অবলোকন করেছি। সরাসরি রাজপথে অবস্থান করে বোঝাপড়া নেয়ার চেষ্টা করেছি। যা আমার জন্য ভিন্ন এক অনুভূতি ছিল। জাতীয় নেতৃবৃন্দের বক্তব্য গুলো গ্যালারি থেকে শোনার চেষ্টা করেছি।

ভেন্যু পরিবর্তন পরবর্তী ১২ ঘন্টার প্রস্তুতিতে এবারের আয়োজন অনেকটা সাবলিল ছিল। তবে সাউন্ড সিস্টেম আপ টু দ্য মার্কে ছিল না, এটা গ্যালারির দর্শনার্থীদের অভিযোগ।

এবারের সমাবেশে প্রায় সকল বক্তাদের বক্ত্যবের স্ট্যান্স একই পাটাতনের উপর ছিল। ফলে দলের এম্বিশন ওভাবে ফুটে ওঠে নি। বডি ল্যাঙ্গুয়েজ পজিটিভ লক্ষ্য করা গেছে। বক্তব্যের ক্ষেত্রে অলটাইম ফেভারিট দ্য স্যানসেশন সিনিয়র নায়েবে আমীর মুফতী সৈয়দ ফয়জুল করীম শায়েখে চরমোনাই তাঁর বজ্র কন্ঠের মুর্ছনায় গোটা সমাবেশকে আন্দোলিত করেন। নতুনভাবে লড়াইয়ের স্ফুলিঙ্গ প্রবাহিত করেন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা নির্ভেজাল, পরিবর্তন উন্মুখ নেতা কর্মী, সমর্থকদের মধ্যে।

দলের আমীর মুহতারাম পীরসাহেব চরমোনাই তাঁর লিখিত বক্তব্যে সমসাময়িক ইস্যুতে নানামুখী খতিয়ান সহকারে সরকারের সমালোচনা করেন ও দলীয় এজেন্ডা ঘোষণা করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা পত্রে উল্লেখিত স্বাধীনতার মূল লক্ষ্য সাম্য মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার উপর গুরুত্বারোপ করেন। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে দলের এম্বিশন উপস্থাপন করেন।

অন্যান্য বিষয়ের সাথে লিখিত বক্তব্যে নারীদের সম্পর্কে দলীয় অবস্থান পরিষ্কার করতে গিয়ে মুহতারাম আমীর বলেন, ইসলাম নিয়ে এই সমাজের কিছু প্রচলিত মিথের কথা উল্লেখ করেন। যেমন ইসলাম ক্ষমতায় আসলে নারীদের গৃহবন্দী করা হবে। তাদের কর্মক্ষেত্র সংকুচিত হবে। এমন আরো নানাবিধ স্ট্রেসে ভোগে এদেশের সুশীল পাড়ার কর্তাব্যক্তিরা।

মুহতারাম আমীর এ ব্যাপারে দৃঢ়চিত্তে ঘোষণা করেন, রাষ্ট্রে ইসলাম বিজয়ী হলে, নারীরা সবচেয়ে বেশি সম্মানিত হবেন। সকল নাগরিক সুযোগ-সুবিধায় নারীদেরকে অগ্রাধিকার দেয়া হবে। নারীদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ আরো বিস্তৃত এবং আরো নিরাপদ করা হবে। যা ইসলামোফোবিক নেটিজেনদেরকে ইসলাম নিয়ে নতুনভাবে বোঝাপড়া নিতে সাহায্য করবে।

তবে অন্যান্য বিষয়ের সাথে দেশের অর্থনীতিতে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখা ও বিপরীতে সবচেয়ে বেশি অবহেলিত জনগোষ্ঠী দেশের সূর্যসন্তান রেমিট্যান্স যোদ্ধা খ্যাত ভাগ্যাহত প্রবাসী বাংলাদেশীদের নিয়ে ইসলামী আন্দোলন এর ভাবনা স্থান পায় নি । প্রবাসীদের সাথে দেশের অর্থনীতি নয় শুধু বিশাল এক জনগোষ্ঠী সম্পৃক্ত রয়েছে। ফলে বঞ্চিত ও ভাগ্যাহত প্রবাসীদের তাদের অধিকার ফিরিয়ে দিতে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এর মত একটি সম্ভাবনাময়ী রাজনৈতিক শক্তির দলীয় অবস্থান, পরিকল্পনা কি, এ নিয়ে প্রবাসী, রাজনৈতিক বোদ্ধা ও নেটিজেনদের কৌতুহলের অন্ত নেই।

সমাবেশ থেকে আগামী তিন মাসের কর্মসূচি হিসেবে বিভাগীয় পর্যায়ে সমাবেশ করার ঘোষণা দেয়া হয়। যা আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ভালোভাবেই নেয়ার ইঙ্গিত বহন করে।

একটি জাতীয় সমাবেশে দলীয় নেতৃবৃন্দের বাইরে মুসলিম লীগ ব্যতিত অন্য ঘরাণার অতিথি লক্ষ্য করা যায় নি। একটি ইনক্লুসিভ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে এই মঞ্চে জাতীয় রাজনীতিবিদ, ওলামায়ে কেরাম, শিক্ষাবিদ , সুশীল সমাজের প্রতিনিধি সহ বন্ধুপ্রতিম সংগঠনের নেতৃবৃন্দের উপস্থিতি সমাবেশকে রাজনৈতিকভাবে আরো ইনক্লুসিভ করতো।

বক্তারা তাদের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ ও এচিভমেন্ট নিয়ে নিজেদের গোল ব্যক্ত করতে গিয়ে চমৎকারভাবে একটি টোটকার কথা উল্লেখ করেন দলের উপদেষ্টা পরিষদের অন্যতম সদস্য, সাম্প্রতিক সময়ে মিডিয়ায় ঝড়তোলা জাতীয় চেয়ারম্যান লক্ষীপুরের চরকাদিরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আল্লামা খালেদ সাইফুল্লাহ। তিনি জোটের এগেইনস্টে জোটকে মোকাবেলায় জোট গঠনের প্রস্তাব করেন। তবে আগামী নির্বাচনে ইসলামী আন্দোলন এর পথচলার নীতি কি জোটভুক্ত বা জোটমুক্ত থাকবে তা নিয়ে নেটিজেনদের কৌতুহলের অন্ত নেই।

আগামী নির্বাচন নিয়ে ইসলামী আন্দোলনের পজিটিভ বডিলেঙ্গুয়েজ বলে দিচ্ছে আগামী নির্বাচনে তাঁরা হয়তো ছেড়ে কথা বলবেন না । মাসব্যাপী দাওয়াতী কর্মসূচির পর এ মহাসমাবেশ সারাদেশের নেতাকর্মীদের কনফিডেন্স বুস্ট আপ করতে অনেকটাই প্রভাবকের ভূমিকা পালন করেছে। ফলে তাদের মধ্যে লড়াইয়ের স্পর্ধার স্পার্ক বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। একে আগামী নির্বাচনে পজিটিভলি এগিয়ে নিতে প্রচুর হোমওয়ার্ক করার বিকল্প নেই।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এর এই গুডগোগিংকে ইনটেনশনালি হোক আন-ইনটেনশনলি হোক ইসলাম পন্থার নবজাগরণ ও স্বাধীনতার প্রকৃত উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন ও পুনরুদ্ধারে যার যার জায়গা থেকে ইসলামপন্থী দেশপ্রেমিক ও দায়িত্ববান নাগরিক সমাজকে এগিয়ে আসা উচিত।

-এম এম শোয়াইব
মডিফায়ার, থট ফর প্রোগ্রেস

Leave a Reply

Your email address will not be published.

error: Content is protected !!