>

ওষুধের বিরূপ প্রতিক্রিয়া Adverse Reactions of Drugs

ওষুধের বিরূপ প্রতিক্রিয়া Adverse Reactions of Drugs

ওষুধ জৈব রসায়নিক দিক থেকে অত্যন্ত ক্রিয়াশীল পদার্থ। এই ক্রিয়া হতে পারে আমাদের অত্যন্ত প্রয়ােজনীয়, প্রত্যাশিত ও উপকারী, আবার একই সাথে কতগুলাে ক্রিয়া হতে পারে অপ্রয়ােজনীয়, অপ্রত্যাশিত ও ক্ষতিকর।
এই সব ক্ষতিকর দিকগুলােকে আমরা ওষুধের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া (Side effect) বা বিষক্রিয়া (toxic effect)বা বিরুপ প্রতিক্রিয়া (Adverse effect) বলে থাকি। এই সব ক্রিয়া ওষুধের স্বাভাবিক মাত্রায় (Normal dose) হতে পারে। যেমন অধিকাংশ ওষুধ সেবনে মাথা ঘােরা, বমি ভাব, পেটে অস্বস্তি ভাব হয়। এন্টিবায়ােটিক ক্যাপসুল সেবনে
অনেকের পাতলা পায়খানা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে হতে পারে। স্বাভাবিক মাত্রার থেকে বেশী মাত্রায় ওষুধ সেবনে বিষক্রিয়া দেখা দিতে পারে। কিছু ওষুধ হঠাৎ করে কিছু রােগীর ক্ষেত্রে স্বাভাবিক মাত্রায় (Usual dose) অপ্রত্যাশিত ক্রিয়া করতে পারে। যেমন পেনিসিলিন ও সালফা ওষুধসমূহ কিছু রােগীর ক্ষেত্রে চামড়ায় এলার্জিক ক্রিয়া করতে পারে।

ওষুধের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়াগুলাে নিচে সংক্ষেপে আলােচনা করা হল :
১। ওষুধের ক্রিয়ার পার্থক্য (Variation in therapeutic response) : ইহা নির্ভর করে শরীরের ওজন ও রােগীর বয়স ভেদে মাত্রার পার্থক্যের উপর। ওষুধের মাত্রার বিষয়ে আলােচনা দ্রষ্টব্য।

২। ওষুধের প্রতি চরম সংবেদনশীলতা (Extreme susceptibility to drugs ) : কোন কোন রােগীর কোন বিশেষ ওষুধের প্রতি চরম সংবেদনশীলতা থাকে যা অন্যদের বেলায় থাকে না। যেমন, সেলিসাইলিজম- কারাে কারাে এসপিরিন কয়েক মাত্রা খাবার পর কানে শোঁ শোঁ শব্দ, অস্বস্তি ও বমি বমি ভাব হয়।

৩। কখনাে সঠিকমাত্রার ওষুধ রােগীর কোন বিশেষ
অস্বাভাবিকতার জন্য তুলনামূলকভাবে অতিমাত্রায় ফলাফল হিসেবে দেখা দেয়। যেমন- কোন রােগীর শরীরে যদি পটাশিয়ামের ঘাটতি থাকে সে ব্যক্তির ডিজিটালিস ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হবে অনেক
বেশী। যাদের কিডনী ঠিকমতাে কাজ করে। না তাদের স্ট্রেপটোমাইসিন (Streptomycin) সাধারণ মাত্রায় দিলেও কানে শােনা এবং শরীরের ভারসাম্য রক্ষার অস্বাভাবিকতা দেখা দিতে পারে। এজমা বা হাঁপানির রােগীদের ঘুমের ওষুধ (যেমন ডায়াজিপাম) দিলে তাদের শ্বাসপ্রশ্বাসের অসুবিধা হয়ে মৃত্যু হতে পারে।

৪। একই সাথে একাধিক ওষুধের ব্যবহার হলে একটা আরেকটার কাজকে বাড়িয়ে দিতে পারে। যেমন- পেথিডিন এবং মাও ইনহিবিটর (MAO-inhibitor) একই সাথে দিলে রােগী বেহুশ হয়ে যেতে পারে। আবার MAO-inhibitor এর সাথে এ্যামফেটামিন (Amphetamine) দিলে রােগীর রক্তচাপ বেড়ে গিয়ে দূর্ঘটনা ঘটতে পারে। MAO-inhibitor খাচ্ছে এমন রােগী যদি পনির খায় যার মধ্যে Tyramine আছে তাহলেও রক্তচাপ বেড়ে যেতে পারে। যারা আলসারের জন্য সিমেটিডিন (Cimetidine) খাচ্ছে তারা যদি ঘুমের ওষুধ খায় তাহলে তাদের ঘুম বেড়ে যায়।

৫। ওষুধের স্বাভাবিক ক্রিয়া যা রােগীর জন্য অনাকাঙ্খিত, যেমন ঘুমের ওষুধে মাথা ঘুরানাে, পেটের ব্যথার ওষুধ, যেমন এট্রোপিন (Atropine) খেলে মুখ শুকিয়ে যায়, কোষ্ঠ কাঠিন্য হয়, দৃষ্টি শক্তি ঝাপসা হয়ে যায়।

৬। চামড়ার উপর ব্যবহার্য ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে ডারমাটাইটিস, একজিমা এবং ব্যথার ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে পেটে ব্যথা ও। জ্বালা পােড়া, এন্টিহিষ্টামিনের জন্য নাক ও মুখ শুকিয়ে যাওয়া ইত্যাদি। হতে পারে।

৭৷ সেকেন্ডারী ফল (Secondary effect) : যেমন, এন্টিবায়ােটিক খেলে পরিপাকতন্ত্রের ব্যাক্টেরিয়া ধ্বংস হয়ে যায়, ভিটামিনের কমতি হতে পারে এবং রেজিসট্যান্ট ব্যাক্টেরিয়া দিয়ে সংক্রামণ হতে পারে।

৮। এলার্জি ও অতিসংবেদনশীলতা বা হাইপারসেনসিটিভিটি : অনেক ওষুধের ক্রিয়ার ফলে এলার্জি, এজমা, এনাফাইলেকটিক শক ইত্যাদি হতে পারে। সাধারণত প্রােটিন কিংবা প্রােটিনের সাথে যুক্ত ওষুধের জন্য এলার্জি হয়। এলার্জির সম্ভাবনা জন্মগত ও পারিবারিক অর্থাৎ কোন কোন বংশের লােকদের এলার্জি প্রবনতা বেশী। এলার্জি অল্পমাত্রায়ও হতে পারে, আবার বেশীমাত্রায়ও ভয়ঙ্কর ধরনের হতে পারে। ভয়ঙ্কর এলার্জীর উদাহরন হিসেবে Penicillin এর জন্য anaphylactic shock এর নাম করা যেতে পারে।

সাধারণ এলার্জীর লক্ষণগুলাে হচ্ছে শরীরের অংশ বিশেষ ফুলে যাওয়া, লাল হয়ে যাওয়া এবং শ্বাসকষ্ট হওয়া। এমন অবস্থায় রােগীকে পায়ের দিকটা উচু করে শুইয়ে দিতে হবে, অক্সিজেন দিতে হবে এবং এক সি.সি. পরিমাণ Adrenaline ( 1:1000) শিরা কিংবা চামড়ার নিচে কিংবা মাংশপেশীতে ইনজেকশন দিতে হবে। প্রতি ২০ মিনিট অন্তর রােগীর নাড়ি দেখে এই ইনজেকশন পুনরায় দেয়া যেতে পারে।

। অস্বাভাবিক জিন (Gene) এর জন্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া : কেউ যদি উত্তরাধিকার সূত্রে অস্বাভাবিক জিন এর অধিকারী হয়, যেমন,গ্লুকোজ-৬ ফসফেটডিহাইড্রোজিনেজ (Glucose-6-phosphate dehydrogenase) এর কমতি হলে কোন কোন ওষুধ, যেমন ম্যালেরিয়ার জন্য প্রিমাকুইন (Primaquine) খেলে তার রক্তের লােহিত কণিকা দ্রুত ভেঙ্গে গিয়ে জন্ডিস ও রক্তশূণ্যতা দেখা দেয়।

১০। সরাসরি বিষক্রিয়া : কোন কোন ওষুধ সরাসরি যকৃত ও বৃক্কের ক্ষতিসাধন করে। বেশীর ভাগ ওষুধই মানুষের যকৃতে বিপাক হয় ও বৃক্কের মাধ্যমে নিঃসরণ হয়। এ কারণে এই দুই জায়গায় অর্থাৎ যকৃত
ও বৃক্কে ওষুধের বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয় বেশী। কোন কোন ওষুধ সরাসরি রক্ত কণিকাকে ভেঙ্গে দেয়। আবার কতগুলাে ওষুধ রক্ত উৎপাদনের কারখানা অর্থাৎ অস্থি-মজ্জার কাজকে ব্যাহত করে।
ক্যান্সারে ব্যবহৃত ওষুধ গুলাের প্রায় সবগুলােই অস্থিমজ্জার কাজকে ব্যাহত করে। কোন ওষুধ যদি প্রতিনিয়ত দেয়া হয় এবং তা যদি যকৃত দ্বারা ঠিক মতাে বিপাক না হয় কিংবা বৃক্কের মাধ্যমে ঠিকভাবে নিঃসরণ না হয় তাহলে শরীরে তা ক্রমাগত জমা হতে পারে। একে বলা হয় কিউমুলেশন (Cumulation)। এই অবস্থায় শরীরেঅতিরিক্ত ওষুধ জমে যাবার সব উপসর্গ দেখা দেয়। কিছু কিছু ওষুধ আছে যা অনেকদিন ব্যবহার করা হয়নি, ফলে মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গিয়েছে। সেই সব ওষুধ যদি ভুলক্রমে বিক্রি করা হয় এবং কোন রােগী তা গ্রহণ করে তবে রােগীর মাঝে বিভিন্ন বিষক্রিয়া দেখা দিতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

error: Content is protected !!